AMAR BANGLA NEWS

ফরাক্কা ব্যারেজের ইন্সপেকশন রোডে মরণফাঁদ: আতঙ্কে ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয়রা, চরম ক্ষোভ

ফরাক্কা ব্যারেজের ইন্সপেকশন রোডে মরণফাঁদ: আতঙ্কে ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয়রা, চরম ক্ষোভ ফরাক্কা ব্যারেজের নিশিন্দ্রা কাটান সংলগ্ন ইন্সপেকশন রোডের চরম বেহাল...

ফরাক্কা ব্যারেজের ইন্সপেকশন রোডে মরণফাঁদ: আতঙ্কে ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয়রা, চরম ক্ষোভ

ফরাক্কা ব্যারেজের নিশিন্দ্রা কাটান সংলগ্ন ইন্সপেকশন রোডের চরম বেহাল দশায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাবে রাস্তাটি বর্তমানে এক বিপজ্জনক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই রাস্তাটি সরাসরি ঝাড়খণ্ডের মূল জাতীয় সড়ক ৮০-এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ভারী পাথর বোঝাই লরি-ডাম্পার নিয়মিত এই পথ ধরে ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে চলাচল করে। পাশাপাশি, পাশেই থাকা ফরাক্কা এনটিপিসি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অ্যাশপন্ড থেকে ছাই বোঝাই লরি ও ডাম্পার যাতায়াতের কারণেই রাস্তাটির আজ এই বেহাল অবস্থা বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। রাস্তার বড় বড় গর্ত ও জমা জলের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন পথচারী, টোটো যাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা। এমনকি বড় বড় ডাম্বার গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কারণেও নিত্যদিন যানজট ও বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে। এই বিপজ্জনক রাস্তার কারণে অনেক অভিভাবক ভয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোই বন্ধ করে দিচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ, ২০২৪ সালের শেষের দিকে জেলা পরিষদ ও পথশ্রী প্রকল্পের অধীনে রাস্তার কাজ শুরু হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তা মাঝপথেই থমকে যায়। ফিডার ক্যানেলের পশ্চিম পাড়ের নিশিন্দ্রা হাই স্কুলে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী, স্থানীয় বহু গ্রামের বাসিন্দা ও ঝাড়খণ্ডের মানুষ প্রতিদিন এই বিপজ্জনক পথ দিয়েই যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্ষা এলে এই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে, এমনকি এই রাস্তায় জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি আদুয়া গ্রামের অষ্টম-নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় গর্তে পড়ে আহত হয় এবং একই দিনে যাত্রীবোঝাই একটি টোটো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে বেশ কয়েকজন মহিলা যাত্রী অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন। এই অচলাবস্থায় সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার কে নেবে?

নিশিন্দ্রা হাই স্কুলের শিক্ষক ডক্টর ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল বলেন, “এই সমস্যাটা দীর্ঘদিনের। কাটানের রাস্তাটার বছর পর বছর একই অবস্থা। সামনেই আমাদের স্কুল, যেখানে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন যাতায়াত করে। এই ভাঙাচোরা খানাখন্দে ভরা রাস্তার জন্য দুর্ঘটনা এখন প্রতিদিনর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কে স্কুলে আসতে চায় না। ২০২৪ সালে জেলা পরিষদ থেকে কাজ শুরু হলেও তা অদৃশ্য কারণে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফরাক্কা ব্যারেজের এই ইন্সপেকশন রোড দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। অবিলম্বে এই রাস্তার স্থায়িত্বশীল সংস্কার প্রয়োজন।”

স্থানীয় বাসিন্দা আতাউর রহমান ওরফে রানা জানান, “রাস্তার পরিস্থিতি খুবই প্যাথেটিক। ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষ প্রতিদিন এই জরুরি রাস্তা ব্যবহার করেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা নিশিন্দ্রা হাই স্কুলে ছোট ছোট কচিকাঁচা বাচ্চারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে। এর আগেও নিশিন্দ্রা কাটানে এক ছেলে সাইকেলসহ পড়ে গিয়েছিল, আজও একটি বাচ্চা মেয়ে পড়ে গেছে। বাচ্চাদের নিরাপত্তা না দিতে পারলে আমরা কিসের উন্নয়নের কথা বলছি?”

পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মিনতি ঘোষের স্বামী দাসু ঘোষ বলেন, “নেতাজির সেতু থেকে নিশিন্দা খেয়াঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি জেলা পরিষদ থেকে করা হয়েছিল। কিন্তু ব্রিজের নিচে কাজ হয়নি। ঠিকাদার সংস্থাকে বারংবার রাস্তাটির জন্য ফোন করেছি, কিন্তু তিনদিন ধরে উনি ফোন ধরছেন না। ঠিকাদার সংস্থার গাফিলতির কারণেই আজ এই বেহাল দশা।”

দক্ষিণ মালদা জেলা যুব মোর্চার সাধারণ সম্পাদক রৌনক সাহা বলেন, “এনটিপিসির অ্যাশপন্ড থেকে প্রতিদিন শত শত লোডেড গাড়ি যাওয়ার কারণে রাস্তার এই অবস্থা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৃণমূল উদ্বোধনের নাটক করেছিল। টাকা লুট হয়েছে। মানুষ আজ ভুক্তভোগী। তবে আশার কথা, রাজ্যে আমাদের ডবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার এসেছে, আমি মানুষকে আশ্বাস দিচ্ছি এই রাস্তা দ্রুত মেরামত করা হবে এবং কাউকে আর ভুগতে হবে না।”

দুর্ঘটনাকবলিত টোটো চালক সুরজিৎ ঘোষ বলেন, “রাস্তায় লাল মার্কিং থাকলেও সব জায়গায় সংকেত ছিল না। জমা জলের নিচে যে বড় গর্ত আছে তা বুঝতে পারিনি, ফলে গাড়ি উল্টে যায়। এটি অত্যন্ত সাংঘাতিক ঘটনা, যাত্রীদের বা আমার বড় কোনো অঘটন ঘটতে পারত। প্রশাসনের অবিলম্বে বিষয়টি দেখা উচিত।”

দুর্ঘটনাকবলিত মহিলা যাত্রী মনিকা পাহাড়িয়া বলেন, “আমরা ঝাড়খণ্ডের মরা বাড়ি থেকে ৫ জন টোটোতে ফিরছিলাম। হঠাৎ করেই টোটোটি গর্তে পড়ে উল্টে যায়। এতে আমাদের একজনের পা ফেটে গেছে ও প্রবল আঘাত পেয়েছে। অবিলম্বে রাস্তাটি ঠিক করা দরকার।”

টোটো চালক সাবিরুল ইসলাম বলেন, “বাচ্চাদের আমরা একা স্কুলে ছাড়তে পারি না, রোজ সাথে করে নিয়ে আসি। রাস্তায় ছাই বোঝাই বড় বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায় যানযট সৃষ্টি হয়। গর্ত ও জলের জন্য গাড়ি উল্টে যাওয়া প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বলেন, “বৃষ্টি হলেই এনটিপিসির গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। এনটিপিসির জন্যই আজ রাস্তার এই পরিণতি। দিনে চার-পাঁচবার এখানে গাড়ি ও টোটো উল্টে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ কেন প্রতিনিয়ত এই ভোগান্তি পোহাবে?”

ফরাক্কা ব্যারেজ জেনারেল ম্যানেজার আরডি দেশ পান্ডে জানান, “এই রাস্তাটা আমাদের কোনো প্রয়োজনে পড়ে না। এর ওপর দিয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে পাথর ও এনটিপিসির ছাই বোঝাই গাড়ি চলে। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় বিধায়ক এসে কাজ করার কথা জানালে আমরা অনুমতি দিই। রাস্তাটি এখন কতটা খারাপ অবস্থায় আছে তা আমার জানা ছিল না, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”

ফরাক্কা ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক সুজয় ব্যাপারি বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সংবেদনশীল। যত দ্রুত সম্ভব রাস্তাটি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”